যশোরে বারোমাসি ফুল ও সবজি উৎপাদনে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ পদ্ধতিতে ব্যাপক সফলতা, চাষীদের সন্তুষ্টি - যশোর নিউজ - Jessore News

Breaking

Post Top Ad


Post Top Ad

Responsive Ads Here

Friday, December 13, 2019

যশোরে বারোমাসি ফুল ও সবজি উৎপাদনে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ পদ্ধতিতে ব্যাপক সফলতা, চাষীদের সন্তুষ্টি

সৌরশক্তি ব্যবহার করায় বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ব্যবহারও নেই এবং পলি হাউজে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও পানি সরবরাহের কারণে অপচয়ও নেই। পোকামাকড়ের আক্রমণ না থাকায় কীটনাশকের ব্যবহারও তেমন একটা না করা লাগে না
কৃষকদের বারোমাসি ফুল ও সবজি চাষের জন্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) যশোরে তিন বছর মেয়াদি “ড্রিপ ইরিগেশন” কর্মসূচি গ্রহণ করে ব্যাপক সুফল পেয়েছে। এই সফলতার আলোকে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের ২৬টি উপজেলায় নতুন করে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিএডিসি যশোরের সেচ বিভাগ এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে “যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় ফুল ও সবজি উৎপাদন সম্প্রসারণে ড্রিপ ইরিগেশন কর্মসূচি”।
ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচতি যশোরের গদখালিতে ড্রিপ ইরিগেশন কর্মসূচির আওতায় ১৫টি ডাগওয়েল (পাতকুয়া) ও ৬টি শেড (পলি হাউস) নির্মাণ করা হয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, ডাগওয়েলের মাধ্যমে খুব গভীর থেকে পানি উত্তোলন এবং উপরে বৃষ্টির পানির ধারা কুয়াতে সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পানিতে আর্সেনিক থাকে না। তাছাড়া সৌরশক্তি ব্যবহার করায় বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ব্যবহারও নেই এবং পলি হাউজে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও পানি সরবরাহের কারণে অপচয়ও নেই। পোকামাকড়ের আক্রমণ না থাকায় কীটনাশকের ব্যবহারও তেমন একটা না করা লাগে না। সব মিলিয়ে এখানে ফুল–সবজি উৎপাদন খরচ কম এবং ফলন অনেক বেশি হয়।
বিদ্যুৎ বা জ্বালানি তেলের খরচ লাগে না এই পদ্ধতিতে ফলে সেচ খরচ নেই বললেই চলে। ঢাকা ট্রিবিউন
ঝিকরগাছা উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের শাহজাহান কবীর চাষাবাদের জন্যে ডাগওয়েল ও শেড (পলি হাউজ) দুটোই গ্রহণ করেছেন, চাষ করছেন জারবেরা। তিনি বলেন, “এই প্রযুক্তি আসার পর গ্রহণ করি। ডাগওয়েল বা পাতকুয়া থেকে সৌরচালিত পাম্পের মাধ্যমে তোলা হয় পানি। আর বর্ষামৌসুমে বৃষ্টির পানি উপরে থাকা চোঙার মাধ্যমে কুয়ায় নেমে আসে। সেখান থেকে থেকে সরবরাহ লাইনের (পাইপ) মাধ্যমে পানি চলে যায় সোজা ফুল ও সবজিক্ষেতে। ফুল ও সবজিগাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে পানি।”
শাহজাহান কবীর বলেন, “আমার এই সেচ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ত্রিশজন কৃষক সম্পৃক্ত। খুব গভীর থেকে পানি উত্তোলন এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহ- দুটোই আর্সেনিকমুক্ত। এই সেচের মাধ্যমে আমরা সুফল পাচ্ছি।”
বিএডিসির এই কর্মসূচির প্রথম গ্রাহক ফুল ও সবজিচাষী ইসমাইল হোসেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি ফুল ও সবজি পালাক্রমে চাষ করে আসছেন।
তিনি বলেন, “আমার ২৪ বিঘার মধ্যে ১২ বিঘা ড্রিপ ইরিগেশনের আওতায়। প্রথমে অল্প পরিসরে কাজ শুরু করেছিলাম। একদিন বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুব আলম সাহেব সরেজমিনে এসে চাষাবাদের সফলতা দেখে যান। পরে এই কর্মসূচি বিস্তৃত হয়।”
পলি শেডে ফসল উৎপাদন হওয়ায় পোকার আক্রমণ হয় না। ঢাকা ট্রিবিউনতিনি আরও বলেন, “পলি হাউজের উপরের দিকে রয়েছে ফগার মেশিন। সেখান থেকে পানি বের হয় কুয়াশার মতই। পলি হাউজের পলিথিন উঠানামা করিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে পোকামাকড়ের আক্রমণ নেই বললেই চলে। সে কারণে কীটনাশকের ব্যবহার করা লাগে না।”
ফুলচাষী মোখলেসুর রহমান বলেন, “বোঁটা লম্বা চায়না রোজের প্রথম জাত আমি ঝিকরগাছায় আনি। এই জাতের গোলাপ বেশ সেনসিটিভ; পরিমিত সেচ ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা না হলে গাছ নষ্ট হয়ে যায়। গত বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিতে আমার প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। আমি ড্রিপ ইরিগেশনের এই পদ্ধতির জন্যে আবেদন করেছি। না পাইলে নিজ উদ্যোগেই সেটি করতে হবে।”
আসাদুল ইসলাম নামে এক চাষী জানান, এই সেচের আওতায় (ডাগওয়েল ও পলি হাউজ) আসতে তাদের ২২ হাজার টাকা জামানত দেওয়া লেগেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে করতে হলে ৩০ থেকে ৪০ লাখের মতো খরচ হবে। যেহেতু সিকিউরিটি মানি খুব অল্প, সেকারণে কৃষকদের এই পদ্ধতি গ্রহণ বেশ লাভজনক।
বিএডিসি (সেচ) যশোর অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝিকরগাছা উপজেলায় ফুল ও সবজি উৎপাদন সম্প্রসারণে তিনবছর মেয়াদিড্রিপ ইরিগেশন কর্মসূচি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুরু হয়। এতে বরাদ্দ প্রায় ৭ কোটি টাকা। ডাগওয়েলের গভীরতা ১৪০ ফুট এবং ১০১০ বর্গমিটার সাদা পলিথিন দিয়ে লোহার কাঠামোর ওপর তৈরি করা হয়েছে পলি হাউজ। হাউজের জন্যে পলিথিন আনা হয়েছে ভারত থেকে, যা ইসরায়েলের তৈরি। এই হাউজ ১২০ কিলোমিটার বেগের ঝড়ো হাওয়া প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম জানান, ঢালাও সেচে পানির অপচয় হয়। এই কর্মসূচিতে চাষি উপকৃত হচ্ছেন। ফুল ও সবজি চাষে খরচ এবং ঝুঁকিও কমছে। এটি কৃষকদের মাঝে সাড়া ফেলেছে। যশোরের ৭৫টি গ্রামে ফুলচাষ হয়। পর্যায়ক্রমে সকলকে এই কর্মসূচির আওতায় আনতে সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
যশোর বিএডিসির (সেচ) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল রশিদ বলেন, “এই উদ্যোগ বিদ্যুৎ-জ্বালানি মুক্ত ও পানি সাশ্রয়ী। ঝিকরগাছা অঞ্চলের কৃষকরা এর সুফল পেয়েছেন, তারা সানন্দে এটি গ্রহণ করেছেন। এই কর্মসূচির সফলতায় দেশের ২৬টি উপজেলায় যেখানে বারোমাসি ফুল ও সবজিচাষ করা হয়, সেখানে নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ২০-২১ অর্থবছরে সেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করা যায়।”

Post Top Ad

Responsive Ads Here